Draft:Language and its' flow

From Wikipedia, the free encyclopedia
Jump to navigation Jump to search


ভাষার সেকাল- একাল ভাষা মানুষের বহির্মুখী প্রতিক্রিয়া যা চেতনার স্তর থেকে স্বরযন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। চৈতন্যই ভাষার দ্রষ্টা এবং স্রস্টা। রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর তাই বললেন, “চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ, চুনি উঠিল লাল হয়ে; গোলাপের দিকে চেয়ে বললুম- তুমি সুন্দর, সুন্দর হল সে…”। যে ভাষাই হোক, মানুষ তার অন্তরের ভাব বিনিময় করে যে মাধ্যম ব্যবহার করে তাই হলো ভাষা। ভাষা ও বার্তা অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত, বা বলা যায় ভাষা বার্তারই নামান্তর। তবে ভাষার উপর বার্তার ভাব নির্ভর করে। বার্তা আগে ভাষা পড়ে- অসম্ভব। এই মাধ্যম সকল প্রাণীর মধ্যে বর্তমান। সরীসৃপ কিংবা অনুন্নত শ্রেনীর প্রাণীদের ভাষা আমরা শুনতে পাইনা, সেক্ষেত্রে তাদের ভাব বিনিময় হয় অনুচ্চারিত শব্দের মাধ্যমে। সে শব্দে হয়তো বর্ণমালা থাকে না, থাকে ভিন্ন ধ্বনি, যেমন সরীসৃপের হিস্.. স্ ....শ্, বাতাসের সো....সো...। এগুলি আমাদের শ্রবনেন্দ্রিয়ের প্রতিক্রিয়া, আমাদের ভাষায় রূপান্তরিত ধ্বনি।আবার এমন কতগুলি শব্দ তরঙ্গ আমাদের শ্রবনেন্দ্রিয়ে এসে পৌছায় যাকে আমরা ভাষা বলি না। যেমন, ঘণ্টার ঢং ঢং ধ্বনি। এর থেকে যখন ভীতি, উল্লাস, দুঃখ, আনন্দ এমন কোন কিছু উপলব্ধি করি না, তাই শুধু ধাতব শব্দ হিসেবে তখন একে গন্য করি। যখন ঘণ্টা ধ্বনি পবিত্র স্থানে আমাদের মনে ভক্তি-ভাব উদ্রেক করে, তখন তা নিঃসন্দেহে স্বর্গীয় ভাষাকে বহন করে। আবার অগ্নি নির্বাপিত দমকলের ঘণ্টা ধ্বনি আমাদের মনে ত্রাসের অনুভুতি সঞ্চার করে। ঘণ্টা ধ্বনি তাই এক্ষেত্রে ভীতির ভাষা। দিল্লির লাল্ কেল্লা মুঘল সাম্রাজ্যের যবনিকার কথা বলে। কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিং বিনয়, বাদল, দীনেশের কথা বলে। এগুলি যেমন অচেতন মাধ্যমের ভাষা,মানব-শরীরের ভাষা চেতন মাধ্যমের ভাষা। সিংহ টা এগোবে না পিছবে-তার ভাবমূর্তি বলে দেয়। অপরাধীর ভাবমূর্তি তার অপরাধের কথা বলে দেয়। ‘বডি ল্যাঙ্গুয়েজ’ লাই ডিটেক্টরের আবশ্যকতা- অনাবশ্যকতার ইঙ্গিত দেয়। মনস্তাত্ত্বিক ,দর্শন বিভাগের মত গোয়েন্দা দফতরের লোকেদের কাছে অব্যক্ত ভাষা যতটা পরিস্কার সাধারন মানুষের কাছে ততটা পরিস্কার নয়। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ঠাকুরের সাথে কথা বলতেন; আমরা কি পারি? এমন অনেক তান্ত্রিক বা সাধু আছেন যারা কোন অপরিচিত দর্শনার্থীর চরিত্র এবং তার কর্মকাণ্ড সবিস্তারে বলে দেন। এমন অনেক প্রাণী আছে যাদের হয়তো বাকযন্ত্র অনুপস্থিত। হয়তো বা তাদের ভাষা আছে, আমাদের শ্রবণ ইন্দ্রিয় সেক্ষেত্রে তাদের ভাষা বুঝতে অক্ষম। অথবা অনুপস্থিত বাকযন্ত্রের ব্যবহারে তাদের কোনো অসুবিধা হয় না, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা তারা প্রয়োজনীয় সংকেত পাঠায় এবং বিশেষ পরিস্থিতিতে তাদের চাহিদা পূরণ করে নেয়। এটা বলা ভাল: উল্টে পড়ে মৃতের ভান করা মাছের শিকার থেকে বাঁচার কৌশল এখানে প্রযোজ্য নয়; ওগুলি অভিযোজনের প্রক্রিয়া। তবে তা একপ্রকার ভাষা যা অব্যক্ত সংবাদকে প্রকট করে। ময়না জাতীয় পাখিদের স্বরযন্ত্র বিশেষ ভাবে উন্নত। এবং তাঁদের বোধ শক্তি ও প্রবল। যেমন সারমেয়দের ঘ্রান শক্তি প্রবল। তাই যে কোন ভাষা ময়নারা অনুকরন করতে পারে এবং হুবহু উচ্চারণ করে। এখানে একটি কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন যে, মনে হতে পারে ‘কথা’ আর ‘ভাষা’ পৃথক। ঠিক, আবার ঠিক নয়। বর্ণ সমষ্টি যুক্ত শব্দ ‘বাক্য’ বা ‘কথা’র মাধ্যমে সুবিন্যস্ত প্রকারে উচ্চারিত হলে তা ভাষার রূপ দেয়। একজন কিছু ‘কথা’ বলছে। সেগুলো যাকে উদ্দ্যেশ করে বলা হচ্ছে তার ক্রোধ উৎপন্ন করছে। তখন তাকে বলতে শোনা যায়- ভাষা সংযত করুন, বা মাইন্ড ইন ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ। মুলত ‘কথা’ যখন ‘বার্তা’ হয়ে যায় তখন সেটা ভাষা। যাই হোক, এটা ব্যাকরন চর্চার জায়গা নয়। ওটা খুব শক্ত বিষয়। এ অধমের কাছে ওটা ভয়ানক। এই ভীতি অত্যাধুনিকতার জন্ম দেয় নি তো! মানুষকে সব থেকে উন্নত প্রাণী বলা হয় এই কারণেই যে, সে অঙ্গপ্রতঙ্গ পরিচালনা করে আঙ্গিক ভাষার সাহায্যে যে কোনো পরিবেশে নিজের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম, আবার মৌখিক ভাষা ব্যবহার করে অতিরিক্ত সুবিধা ভোগ করে। মানুষ মুখ নিঃসৃত বিভিন্ন ভাষা প্রকাশ করতে সক্ষম। বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ব্যবহার করে আমরা বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাদের অন্তরের ভাব প্রকাশ করি। এক্ষেত্রে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সঞ্চালনের প্রক্রিয়া ভাষারই সামিল। শিক্ষার সাথে রুচির পরিবর্তন ঘটে। ভাষা, তাই বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন অর্থ বহন করে। আদিম, অসম্পূর্ণ ভাষা সেকারনে শিক্ষার সাথে সাথে অনেক ক্ষেত্রে বিকশিত হয়েছে। শিক্ষা প্রকৃত অর্থে সঠিক থাকলে রুচির ভাবে তার সৌন্দর্য প্রতিভাত হয়। একটা সময় ছিল যখন নর-নারি নয়নের মাধ্যমে ভালাবাসা বা প্রেম ব্যক্ত করত, বিনিময় করত। মুখে তাদের ভাষা হারিয়ে যেত। চোখের ভাষাই ছিল সব। পাশ্চাত্যে প্রেমের বন্যা এই সময় দেখা গিয়েছিল লর্ড বায়রন, পাবলো, জন কীটস প্রমুখ বিশ্বজয়ীদের কলমে। এদেশে সরোজিনী নাইডু, কমলা দাস, তরু দত্ত প্রমুখ লেখক-লেখিকাদের কলমে উঠে এসেছে আবেগঘন ,দেশাত্ম বোধক সৃষ্টি। কণ্ঠ শিল্পীরা কথা ও সুরে যেসব গান রচনা করেছেন সেগুলি যেমন স্নিগ্ধ, শীতল, মর্মস্পর্শী তেমনি ভাষার সমৃদ্ধিতে ভরপুর কালজয়ী সাহিত্য একপ্রকার স্বর্গীয় বাতাবরণ তৈরি করেছে। সেকারনে “…ধানের শীষের উপর …শিশির বিন্দু” দর্শনের মত আন্তরিক স্পৃহার জাগরন হয়েছিল মানুষের মনে মনে। অনেক আধুনিক কবি-সাহিত্যিক বিশেষত বাংলা ভাষার মন্বন্তরকে রুখে দিয়েছে। তাঁরা চেষ্টা করেছে উত্তরসূরিদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার। পরবর্তী কালের কণ্ঠ শিল্পী ক্রন্দনের সুরে সঙ্গীত পরিবেশন করলেও কান্না পায় না। তবু মেঘের আড়ালে সূর্য তো থাকে; না হলে আধুনিক শিল্প-সংস্কৃতির মরূভুমিতে মরুদ্যানের চিহ্ন থাকত না। সময় পেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ভাষার কমনীয় রূপ বদলে যেতে দেখা যায়। পোশাক, ঘরবাড়ি, ইত্যাদি অনেক শিল্পে ভাষার রুক্ষতা পরিদর্শিত হয়। চলচ্চিত্র শিল্প এর প্রভাব থেকে বঞ্চিত থাকে কেন! প্রকৃতির ভাষা একই আছে। জানোয়ারদের ভাষাতেও জোয়ারভাটা দেখা যায় না। মানুষের ভাষাই শুধু বিবর্তিত হয়েছে। ভাষার আত্মপ্রকাশ ঘটে শিক্ষা থেকে। শিক্ষা ইতিবাচক-নেতিবাচক, লব্ধ-অলব্ধ, প্রকাশ্য-নিঃশব্দ,ইতর-উন্নত যে স্তরেই থাকুক; ভাষার অভিভাবক থেকে ভাষার সন্তানরা জ্ঞান লাভ করে। যে জ্ঞান রাজসিক, তামসিক, সাত্ত্বিক –এই তিনটি গুনের অধীনে আচ্ছন থাকে। ভারত বর্ষের শিল্প-সাহিত্যে বিভিন্ন সময় এইসব গুনের পৃথক পৃথক প্রভাব লক্ষ করা যায়। সাত্ত্বিক থেকে রাজসিক এবং রাজসিক থেকে তামসিক গুনের প্রাবল্য বাংলা তথা ভারত বর্ষে বিস্তার লাভ করে। পাল, সেন,মুঘল,ইংরেজ নিশ্চয় একই ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করেনি! সংস্কৃত ভাষা যে পরিমানে ভারতের শিল্প-কলা-কে পরিপুষ্ট করেছে পরবর্তী কালে অন্যান ভাষা তাই কি পেরেছে? সাত্ত্বিক গুনের আধিক্য বিস্তারিত হয়েছে বিভিন্ন যুগ–পুরুষ, মহাপুরুষের আবির্ভাবে। তারপর তা স্তিমিত হতে হতে তামসিক যুগে প্রবেশ করে। এই সময় কিছু বিজ্ঞান মনস্ক ব্যাক্তিত্বের উত্থান হয়। তার সাথে যান্ত্রিক-প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটে। শিক্ষার সরোবরে অবিচক্ষণতার নোনা জল গড়িয়ে অনিবার্য কলুষতায় সরোবরের স্বচ্ছতা, নির্মলতা, সৌন্দর্য, ভাব নষ্ট হতে লাগল। তবু ভাষার কদর আছে। ভাষার মৃত্যু নেই। এই দিয়েই প্রানি গোষ্ঠী বিবর্তনের সাথে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার অভ্যাস অব্যাহত রাখে। যে যত বেশি ভাষা রপ্ত করে সে ততবেশি সুবিধা আদায় করে। এরজন্য কেউ দোভাষী, ত্রি - ভাষী আবার কেউ বহুভাষী। শ্রী অরবিন্দ পৃথিবীর কোন্ ভাষা না জানতেন! ভাষা ভিন্ন হতে পারে তবে সব ভাষারই উদ্দেশ্য এক। এরকম মনে করার প্রয়োজন নেই যে ইংরেজি ভাষা উন্নত, বাংলা, হিন্দি বা অন্যান ভাষা অনুন্নত। সেক্সপিয়েরর বিখ্যাত উক্তিঃ অল দ্যা ওয়ার্ল্ড ইজ এ স্টেজ , উই আর একটরস এন্ড একট্রেসেস”। হতে পারে ইংরেজিতে এই ভাষা পৃথিবী ব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে, কেননা ইংরেজি ভাষা বহু দেশে ব্যবহৃত হয়। আবার সেই একই দর্শন রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের কণ্ঠে এসেছে বাংলা ভাষায় তাঁর অতি সাধারন অভিজ্ঞতা থেকেঃ “…এখানে কর্ম করতে আসা, পাড়াগাঁ (বাড়ি) থেকে লোকেরা শহরে কর্ম করতে আসে, আবার বাড়ি ফিরে যায়।“ ভাষার তফাৎটা একটা জায়গায়ঃ ‘অভিনয়’ এবং ‘কর্ম’। এখানে রামকৃষ্ণ দেবকে যদি বলা হয় অপ্টিমিষ্ট, সেক্সপিয়ের তাহলে পেসিমিষ্ট। কেননা ‘অভিনয়’এর মধ্যে মনুষ্য ধর্মের মূল উদ্দেশ্য (কর্ম) ব্যক্ত হয়নি। ভাব আলাদা। (রামকৃষ্ণ দেব যে একজন বহু বড় দার্শনিক-সে কথা পরিস্কার করে কোথায় লেখা হয়েছে! অবশ্য যিনি ভগবান তাঁর কেন উপাধি হবে!) চারটি আর্য সত্য বেদান্তে যা বর্ণিত, রামকৃষ্ণ দেব, গৌতম বুদ্ধের কাছ থেকে প্রায় একই ভাবে ঘোষিত হয়েছে। ভাষা পৃথক। ভাব এক। যেমন ছোট্ট জনগোষ্ঠী ভিল, মুন্ডা বা জারোয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা স্বতন্ত্র ভাষায় কথা বলে, কিন্তু তাতেই তাদের প্রয়োজন মিটে যায়। তবে সমাজে অগ্রবর্তী হওয়ার ক্ষেত্রে তাদের ভাষা তাদেরকে পিছিয়ে রেখেছে। কারণ উন্নত জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির বাহক যে যে ভাষা বিদ্যমান পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে তারা সেটা গ্রহন করেনি অথবা গ্রহণ করতে পারেনি। সেকারনে তাদের ভাষা সতন্ত্র,সমাজ সতন্ত্র, দৃষ্টি ভঙ্গিও স্বতন্ত্র। ভাষার কারনে তারা আজও বিশেষ প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল এরকম জনজাতি থেকে কেউ কেউ পরাশুনা করে উঠে আসে এবং মাতৃ ভাষার পাশাপাশি প্রচলিত আঞ্চলিক বা ব্যাপকভাবে প্রচলিত দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন করে তার পিছিয়ে পড়া সামাজের কাছে মাথা উঁচু করে দাড়ায়, সে জাতির বিকাশের দিকে এগিয়ে যাওয়ার রসদ খুঁজে নেয়। উদাহরন হিসেবে উল্লেখ করতে হয়- বিরসা মুণ্ডা [ রাঁচি, বিহার ], যাত্রা ওঁরাও [ গুমলা, ঝাড়খণ্ড ], এবং আরও অনেক। আমেরিকার অ্যামাজন কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার বেশ কিছু জন গোষ্ঠী অপেক্ষাকৃত কম কথা বলে। প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশ তাদের ভাষার অন্তরায়। আন্দামানের জারোয়া সম্প্রদায় বহু শতাব্দী যাবৎ প্রকৃতিকে আগলে বেঁচে আছে। যদিও তারা সভ্য মানুষের সংস্পর্শে এসে বুঝেছে, তাদের প্রাচীন মর্যাদার অবক্ষয়ের কোন বিপদ নেই, তবু তারা তাদের সীমিত ভাষা ব্যবহার করে প্রাকৃতিক পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ ভোগ করে। ভাষার গুরুত্ব তাদের প্রকৃতির কাছে হার মেনেছে, বলা যায়। মূক, বধির-দের মত বিশেষ ভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের অনগ্রসরতার কারন শুধু আঙ্গিক ও সীমিত মৌখিক ভাষার ব্যবহার। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি এবং সমাজের কিছু সাধু ব্যক্তির সৌজন্যে তাদের অনেকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছেন।আমেরিকার হেলেন কেলার, ভারতের (রাইপুর) সাধনা ধান্দ- দের মত অনেকে ভাষার প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন। আবার স্বাভাবিক শিক্ষিত ব্যাক্তিদের মধ্যে অগ্রসরতার অসামঞ্জস্যতা লক্ষণীয়। কারন, ভাষা-বৃক্ষের শাখায় দুই প্রকার ফুল প্রস্ফুটিত হয়। একটি হল আদরণীয়, অপরটি অনাদরণীয়। মাটি, জল খনিজ পদার্ধের উপর তার তারতম্য নির্ভর করে। বিদগ্ধ সাহিত্যিকেরা যা সৃষ্টি করেন তা উর্বর দৃষ্টিভঙ্গির অমৃত-ফল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভাষার সন্তানদের রুচি-বোধ অমৃত-ফলের ভাষা নিয়ে দন্ধে পতিত হয়। ভাষার মর্ম তাদের কাছে দুর্বোধ্য। সময় বদলেছে; সভ্যতার পরিবর্তনের সাথে সাথে ভাষারও পরিবর্তন ঘটেছে। ‘সভ্যতা’ শব্দটি যেন সভ্যতার বিশ্বাস ঘাতক! না কি বলা ভাল খল নায়ক! যাই হোক; বিদ্যাপতি, চণ্ডী দাস,সুব্রামানিয়া ভারতী, ফকির মোহন সেনাপতি,বঙ্কিম চন্দ্র, মধুসুদন, রবি ঠাকুর, শরৎচন্দ্র- দের যুগ শেষ। তৎকালীন সাধু ভাষার সাথে অন্যান ভাষার মৃত্যু হল। বহু যুগ পেরিয়ে আসা প্রাচীনতম সংস্কৃত ভাষার কবরে দারিয়ে নুতন যুগের মানুষ নুতন ভাষায় বলছে-কেন অতীতকে টান, পাষ্ট ইজ পাষ্ট, থিঙ্ক পজিটিভ ইত্যাদি। প্রত্ন তাত্ত্বিকেরা চেষ্টা করে জাদুঘরে রাখা এদের কঙ্কাল নিয়ে উৎসাহী বিদ্যার্থীদের সাথে পর্যালোচনা করার। চলিত ভাষা বা আধুনিক ভাষা হল কলির বরদান। ব্যাকরণের আক্রমন এবং তৎভব-তৎসম, ব্রজবুলি, চর্যা ইত্যাদির উৎপাতে যারা নাজেহাল তারাও লিখতে পড়তে এখন সাবলীল বোধ করে। এ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। নিরাভরণ নারী আর অলঙ্কার-ভূষিত নারির মধ্যে যেন সৌন্দর্যের কোন পার্থক্য নেই! ভাষার এই পরিবর্তনের জন্য ভাষাকে অনেক আঘাত সহ্য করতে হয়েছে। ক্ষত বিক্ষত হয়েও সে নুতন সভ্যতাকে মেনে নিয়েছে। আধুনিক ভাষা যেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অস্ত্র হয়ে উঠেছিল। কাজী নজরুল ইসলাম, নবীন সেনদের মত অনেকের গর্জে ওঠা কলমে বিপ্লবের আগুন ঝরে ছিল। আবার আরেক দিকে আধুনিকের যাত্রা চমকে দিল বাংলাকে আবুল বাশার, মুজতবা আলি, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ সাহিত্যিকদের ক্ষুরধার কলমে। যেমন, কবি সুকান্তের কলমেঃ “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসান রুটি”। নিরাভরণ নারি যেন নুতন সৌন্দর্যে উপনিত হল। স্বামী বিবেকানন্দঃ জীবে প্রেম করে যেই জন, সেইজন সেবিছে ঈশ্বর “। এই ভাষা যে বোঝে তার জীবন সার্থক। মাতৃ ভাষার ক্ষেত্রে তার বিপ্লব নেই। এখানে সে যেমন ছিল তেমনি আছে; “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান”-সত্য হলেও বৈষম্যের কটাক্ষ অনুভুত হয়। বস্তুত, গ্রহনের ক্ষেত্রে ব্যক্তির শিক্ষা, পেশা, ও রুচির ভাব এখানে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যে কোন ভাষা সংযম রক্ষা করে ব্যবহৃত হলে তা সর্বক্ষেত্রে গ্রহণীয় হয়। আবার যে ভাষা মনকে ছুঁয়ে যায় তার জন্য ব্যাক্তির মাতৃভাষা ভিন্ন হলেও সর্ব ক্ষেত্রে আদরণীয় হয়ে থাকে, সেখানে ব্যাক্তির পরিচয় নিষ্প্রয়োজন। বিদেশি ভাষায় রচিত সাহিত্য-শিল্পকর্ম বাংলা তথা ভারতবর্ষে সমাদৃত। কোন ভারতবাসী বলে কি –ডিকেন্স কিংবা হেমিংওয়ে, ইলিয়ট, কিংবা আফ্রিকার মরিসন-দের ভাষা ভাল লাগে না ! বরং কবিগুরুর ‘গীতাঞ্জলি তে সেক্সপিয়ারের শৈলী লক্ষ করা যায়। বিশ্ব কবির গ্রন্থ প্রকশনা বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তে দেখা পাওয়া যায়। (একবার সোশ্যাল মিডিয়ার কোন একটি কক্ষে আমার একটি লেখাতে কিছু পংতি উদ্ধৃত হয়েছিল ইংরেজিতেঃ “যদি তোর ডাক শুনে…”। আমার কানাডিয়ান বন্ধু সঙ্গে সঙ্গেই লিখে পাঠালেন, “ ইয়েস, আই নো দিস সং”)। আবার ‘পথের পাঁচালি’ ফরাসি ভাষা সহ ইংরেজি ও বহু বৈদেশিক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তেমনি স্পিল বার্গের সৃষ্টিতে সত্যজিৎ রায়ের ছায়া পড়েছে। ভাষার আদানপ্রদান পৃথিবীব্যাপি চলছে, চলবে।

ভাষার কঠিনতা, কর্কশতা, মিষ্টতা, নমনীয়তা অনেকাংশে জয়-পরাজয়ের কারন হয়ে দাড়ায়। মধুর বচনে যে কাজ সহজে সমাধান হয়, কর্কশতায় তা কঠিন ,এবং বিসম্বাদে গিয়ে পৌঁছায়।    আবার ‘মধু তিষ্টতি জিহ্বাগ্রে হৃদয়ে তু হলাহলম’ হওয়াটা বাঞ্ছনীয় নয়। এটা ধূর্তদের প্রবৃত্তি। রাজনৈতিক, সামাজিক, আর্থিক প্রেক্ষাপটে ভাষা রূপ বদল করে। অর্থাৎ আবেগ, ক্রোধ ইত্যাদি রিপু গুলির মধ্যে বিশৃঙ্খলা ঘটে। ভাষা- কে পর্যবেক্ষণ করা এবং তা অনুধাবন করা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক হয়ে ওঠে না। যে বিষয় সামাজিক ভাবে স্বীকৃত রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে তা বিকৃত। যেমনটা ঘটেছিল চিত্র শিল্পী রাজা রবি বর্মার ক্ষেত্রে। মকবুল ফিদা হুশেন ও সমালোচিত হয়ে ছিলেন সামাজিক ও ধর্মীয় সঙ্ঘাতে। অথচ তাঁদের সৃষ্টির ভাষা তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিতে যথার্থ। তাহলে একজনের দৃষ্টি ভঙ্গিতে যে ভাষা ব্যক্ত হয় তা আরেক জনের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে। এটা ঘটে যখন প্রেক্ষাপটগুলির পরিবর্তন হয়। শিল্প কর্মে ভাষার সংযম দুরুহ। তাতে শিল্পীর শিল্প কলার বিঘ্ন ঘটে বই কি। আবার আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া এমন মানুষের কাছে সেই শিল্পের দাম নেই। একজন ধনকুবের কোন একটি তৈল চিত্র এক লক্ষ অর্থে সংগ্রহ করলেন। সেই চিত্র ভুবন মোহিনী ‘মনালিসা’র হোক। একজন গরিব ব্যাক্তির কাছে তা অর্থহীন। তার কাছে কোন রাজনৈতিক নেতার রহস্যপূর্ণ আর্থিক প্রতিশ্রুতির বাক্য বেশী গ্রহণ যোগ্য। সেই ভাষাকে সে বিশ্বাস করে।আগ্রহ জন্মে। সামাজিক প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে  সে উজ্জীবিত হয়। একই প্রতিশ্রুতি যদি ভিন্ন ব্যাক্তি বা সাধারন গৃহস্থের হত, সেটা সে গ্রহণ করত না।  যেমন, দূরভাষ্যে  পাকিস্তান যখন বলে, “আমি ইণ্ডিয়াকে ভালবাসি।“ সে ভাষার কোন অর্থ হয় না। ভারতীয় জোয়ানের মুখ নিঃসৃত সেই একই ভাষা অনেক বিবেকবান ভারতবাসির চোখে জল এনে দেবে।  তেমনি নভচর রাকেশ শর্মার উক্তি- “ সারে জহা সে অচ্ছা” (পাকিস্তানের জাতীয় কবি মুহাম্মদ ইকবাল সাহেবের রচনা) তৎকালীন প্রধান মন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর রুচিকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে পরবর্তী কালে তা ভারতের দেশভক্তি গানে অলংকৃত হয়ে সুর  সম্রাজ্ঞী লতাজির কণ্ঠে ভারতবাসীকে ভাবাবেগে আপ্লূত করে রাখে।  এই ভাবে পাকিস্তানের ভিন্ন ভাষী কণ্ঠ শিল্পীরা এ দেশে যথেষ্ট আদরণীয়। চীন, আফ্রিকা, সহ বিভিন্ন দেশ বাংলা ভাষা চর্চা করে। আমরা যেমন ওয়ার্ডসওআর্থ, আগাথাক্রিষ্টি , ম্যাক্সিম গর্কি  প্রমুখ বিদেশি সাহিত্যিকদের বিষয়কে সযত্নে অধ্যয়ন করি, তাঁরাও এই দেশের বিভিন্ন ভাষায় রচিত গ্রন্থ পড়ে আনন্দ উপভোগ করে। কারন, এসব সাহিত্যে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে তা সাত্ত্বিক গুনে রঞ্জিত। এর ধারাবাহিকতা যদি বজায় থাকত পুস্তকে, গানে, নাটকে, চলচ্চিত্রে , হয়তো তামসিক অত্যাধুনিকের ইন্দ্রজাল থেকে বেড়িয়ে  এসে মানুষ বাস্তব-অবাস্তবের প্রভেদটা বুঝতে পারত। বিভিন্ন মঠ-মন্দিরের পণ্ডিতগন  যেমন সেই ঐতিহ্যের সংস্কৃতিকে লোক-শিক্ষার কাজে প্রয়োগ করেন। না হলে তো ভাষার ভিত যে শিক্ষা সে শিক্ষাকে পর্যদুস্ত হতে হবে মুঠো ফোনের মত যান্ত্রিক সভ্যতার  কাছে। নতুন যুগের লেখকদের কলমে চোখে পড়ে এমন কিছু শব্দ যা ভাষার উপদান, যেগুলি হয়ত যুক্তি দিয়ে তৈরি এবং তা সংবাদ পত্রে ছাপাও হয়! যেমন, ফল বিষাক্ত হয়, কীট বিষাক্ত হয়, তবে সকাল কেন বিষাক্ত হবে না! তাই, নুতন শব্দ তৈরি হল ‘বিষাক্ত সকাল’। আশঙ্কা সে কারনে হয় বাংলার সংস্কৃতিকে নিয়ে। হয়তো হারিয়ে যাবে বাংলার সংস্কৃতি!  আগামী প্রজন্মের কাছে ভাষা নেবে এক কদর্য রূপ। অপিনিহিতি, স্বরভক্তি ইত্যাদির বিশৃঙ্খলায় জন্ম নেবে কোন অপভ্রংশ বা বিকৃত ভাষা। মৃত্যু হবে সাহিত্য-সংস্কৃতি সৃষ্টির সদিচ্ছা! হারিয়ে যাবে সম্ভ্রম, বিনয় ও নম্রতা এবং তাদের ভাষা। যেমন, আধুনিক সংস্কৃতবানদের কাছে ‘শ্রী চরন কমলেষু’ অপ্রযোজ্য মনে হয়েছে। সে ভাষা হারিয়ে গেছে। যেমন,হারিয়ে গেছে কবিতার ছন্দ।  হারিয়ে গেছে ইংরাজি সাহিত্য থেকে রমনী-রঞ্জক বা সৌজন্য মূলক ভাষা; মানবিক, ধর্মীয় ভাষা! হারিয়ে যাচ্ছে আধ্যাত্মিক কিংবা ভক্তিমূলক বাউল, কবিগান ইত্যাদি। এর প্রভাব পড়ছে নাটক, ছায়াছবি ইত্যাদির উপর। অথচ একটা সময় রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের ভাষায় এগুলো ছিল “লোকশিক্ষা”র মাধ্যম। নুতন প্রজন্মের কাছে কি বার্তা পৌঁছচ্ছে? তারা কি ভাষার সঙ্গে মহাপুরুষকেও টেনে কটাক্ষ করে বলবে ‘মধ্যযুগীয়’? বয়োঃজেষ্টদের সম্মান প্রদর্শনে ‘আজ্ঞে’ বলার রীতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ভারতীয় সংস্কৃতির কৃষ্টি এখন সীমিত শ্রেণীর মানুষের কাছে।

References

[edit | edit source]